দুই যুগেও চালু হয়নি হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়

0
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
উদ্বোধনের প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি কিশোরগঞ্জ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়। জনবল সংকটে কার্যত অচল হয়ে থাকা সরকারি এই কার্যালয়ের ভবন এখন জরাজীর্ণ। ভেঙে পড়ছে দরজা-জানালা, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে টিনের চাল। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে জন্মেছে আগাছা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সরকারি আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। এমনকি অরক্ষিত কার্যালয়ের ভেতরে এখন ছাগলের বিচরণও দেখা গেছে।
কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব তারাপাশা এলাকায় হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও জলাভূমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যেই নির্মাণ করা হয়েছিল হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই আঞ্চলিক কার্যালয়। বাইরে থেকে সাইনবোর্ড ও গেট দেখে সচল সরকারি দপ্তর মনে হলেও ভেতরের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। উদ্বোধনের প্রায় দুই যুগ পরও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরাঞ্চলের মানুষ।
প্রায় ৬৫ শতাংশ জায়গার ওপর নির্মিত কার্যালয়টিতে রয়েছে আটটি অফিস কক্ষ। কর্মকর্তাদের থাকার জন্য রয়েছে ছয়টি কোয়ার্টারও। স্থায়ীভাবে ১৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। তাদের মধ্যে নিয়মিত অফিস করেন শুধু একজন নিরাপত্তা প্রহরী। কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা উপপরিচালক ঢাকায় অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙা। টিনের চালের বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ভবনের চারপাশ ও ভেতরের বিভিন্ন স্থানে আগাছা জন্মেছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অফিস কক্ষগুলোতে পড়ে থাকা চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। অরক্ষিত ভবনের বিভিন্ন অংশে ছাগল বিচরণ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কার্যক্রম না থাকায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজাদ বলেন, হাওর উন্নয়ন ও হাওরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার কথা এই দপ্তরের। এটি একটি গবেষণা কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু গবেষণা তো দূরের কথা, এখানে কোনো কর্মকর্তাকে নিয়মিত আসতে দেখা যায় না। এত জায়গা নিয়ে এই অফিস করা হলো, অথচ যদি কাজই না হয় তাহলে এটি করার প্রয়োজন কী-এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ওমর সিদ্দিক বলেন, কিশোরগঞ্জের ছয়টি উপজেলা হাওরাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। অথচ এই আঞ্চলিক কার্যালয়ের কার্যক্রম আমরা দেখি না। এটি শুধু নামেই আঞ্চলিক অফিস। তিনি বলেন, অফিসটি ভেঙে পড়ছে, ভেতরের জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। এমনকি এখন এটি ছাগল পালনের জায়গায় পরিণত হয়েছে। জঙ্গলের মতো হয়ে থাকা এই সরকারি কার্যালয়ের দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার।
হাওর রক্ষা আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক এনামুল হক ইদ্রিস বলেন, বাংলাদেশের বোরো ধান উৎপাদনে হাওরের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম হাওরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের কথা বিবেচনা করেই এখানে আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকে কার্যালয়টি হাওরের উন্নয়নে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমানে কার্যালয়টি নেশাখোরদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। ভবনটি এখন ছাগল চরানোর মাঠে পরিণত হয়েছে। অথচ জলাভূমির উন্নয়ন, হাওরের মানুষের জীবনমান পরিবর্তন এবং এক ফসলি জমিকে কীভাবে দুই ফসলি করা যায়-এসব বিষয়ে গবেষণা ও পরিকল্পনা করার কথা ছিল এই দপ্তরের। সরকারের উচিত দ্রুত বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষি, মৎস্য ও জলাভূমির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। প্রতি বছর আগাম বন্যা, জলাবদ্ধতা, ফসলহানি, যোগাযোগ সংকটসহ নানা সমস্যায় পড়তে হয় হাওরবাসীকে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করার কথা হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের। কিন্তু আঞ্চলিক কার্যালয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না থাকায় সেই কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই অঞ্চলের মানুষ।
কিশোরগঞ্জ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপপরিচালক মোহাম্মদ তানভীরুল হক বলেন, তিনি কার্যালয়টির অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। জরুরি কোনো কাজ থাকলে সেখানে যাওয়া হয়। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অফিসটির বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে ভবনটি সংস্কারের জন্য বরাদ্দ হয়েছে। অধিদপ্তরের নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ার না থাকায় কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। খুব দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং ভবন সংস্কারের মাধ্যমে কার্যালয়টির কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
Share.