স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদের জামাতের স্থান ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে সংঘটিত ভয়াবহ জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্ণ হলো আজ (৭ জুলাই)। ২০১৬ সালের ৭ জুলাই সকাল। ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে লাখো মুসল্লি ঈদুল ফিতরের জামাতে অংশ নিতে সমবেত হয়েছেন। ইমামের বয়ান শোনার অপেক্ষায় থাকা মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠের চারপাশে অবস্থান নিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঠিক সেই সময় ঈদগাহ মাঠের অদূরে আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে মুফতি মোহাম্মদ আলী মসজিদসংলগ্ন পুলিশের নিরাপত্তা চৌকিতে জঙ্গিরা হামলা চালায়। হামলার শুরুতে গ্রেনেড বিস্ফোরণের পাশাপাশি চাপাতি ও কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশ সদস্য জহিরুল ইসলাম ও আনসারুল হককে।
এরপর পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে জঙ্গিদের বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। গোলাগুলির একপর্যায়ে পাশের বাড়িতে রান্না করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন গৃহবধূ ঝর্ণা রাণী ভৌমিক। পুলিশের পাল্টা গুলিতে নিহত হয় জঙ্গি আবির রহমান। হামলায় আরও অন্তত আটজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।
ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পিস্তলসহ আটক করা হয় জঙ্গি শরীফুল ইসলাম ওরফে শফিউল ইসলামকে। তাকে চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ওই বছরের ৪ আগস্ট রাতে চিকিৎসা শেষে কিশোরগঞ্জে আনার পথে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার বড়াইগ্রাম এলাকায় শফিউল ইসলামকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের সময় তিনি নিহত হন।
এ ঘটনায় দায়িত্বে থাকা তৎকালীন পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সামসুদ্দিন বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলায় জঙ্গি শফিউল ইসলাম ও জাহিদুল হক তানিমের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা জঙ্গিদের আসামি করা হয়।
তদন্ত শেষে মোট ২৪ জনকে আসামি করা হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বন্দুকযুদ্ধে ১৯ জন নিহত হন। নিহতদের বাদ দিয়ে ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পুলিশ আদালতে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযুক্তরা হলেন জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, জাহেদুল হক ওরফে তানিম এবং আনোয়ার হোসেন। তাদের মধ্যে বড় মিজান ও আনোয়ার হোসেন গত বছরের মে ও জুলাই মাসে হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করেন।
বর্তমানে মামলাটি কিশোরগঞ্জ সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক সুপ্রিয়া রহমানের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর। রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মামলার ১০২ জন সাক্ষীর মধ্যে ইতোমধ্যে ৬৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. শাহ কামাল সরকার বলেন, শোলাকিয়া জঙ্গি হামলার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। পাঁচজন আসামির বিরুদ্ধে বিচার চলছে। ১০২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুত সম্পন্ন করে বিচারকাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
দীর্ঘ এক দশকেও বিচার শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহত ঝর্ণা রাণী ভৌমিকের স্বজনরা। ঝর্ণা রাণী ভৌমিকের ছেলে শুভ দেব ভৌমিক বলেন, শোলাকিয়া জঙ্গি হামলায় আমার মা নিহত হয়েছেন। জীবিত থাকা অবস্থায় আমার বাবা এই হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। আমার মাকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনার স্মৃতি এখনও তাদের আতঙ্কিত করে। ঈদের মতো পবিত্র দিনে এমন নৃশংস হামলার ভয়াবহতা তারা আজও ভুলতে পারেননি।